মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

ঘটনাপুঞ্জ

বাংলাদেশে সমবায় আন্দোলনের সূচনা, ক্রমবিকাশ এবংবর্তমান অবস্থা :

ভারতীয় উপমহাদেশে (বর্তমান বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান ) ১৯04 সালে সমবায়ের যে আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত ঘটে, তার মূলে ছিল কৃষি ও কৃষকদের বহুবিধ সমস্যা, যেমন : কৃষি-ঋণের অভাব, মহাজনী ঋণের চক্রবৃদ্ধি সুদের দরুন নিঃস্বতা এবং মান্ধাতা আমলের অলাভজনক কৃষি পদ্ধতিতে কৃষকদের ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য । এসব সমস্যার দরুন ইতোপূর্বে 1875 সালে ভারতের দাক্ষিণাত্যের বিভিন্ন জায়গায় কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয় । মহাজনী প্রথা নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকদেরকে ঋণ ও রিলিফ বাবত সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে কয়েকটি আইন ও প্রণয়ন করা হয় । কিন্তু প্রত্যাশিত সুফল অর্জিত হয়নি । এ প্রেক্ষিতে মাদ্রাজ প্রাদেশিক সরকারের উর্দ্ধতন কর্মকর্তা স্যার ফ্রেডারিক নিকলসন জার্মানী সহ ইউরোপের কয়েকটি দেশের কৃষি ও ভূমি-ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ শেষে দু খন্ডের এক রিপোর্ট (1895/98) উপমহাদেশের প্রত্যেক গ্রামে সকল দরিদ্র অধিবাসীর প্রধান প্রধান সমস্যার প্রতিকার কল্পে এবং তাদের যাবতীয় উন্নয়ন কর্মকান্ডের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে “সমবায় গ্রাম-ব্যাংক’ স্থাপনের সুপারিশ করেন । অতঃপর 1901 সালে, ইন্ডিয়ান ফেমিন কমিশনের সুপারিশ মতে এবং তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন কর্তৃক গঠিত তিন সদস্য বিশিষ্ট ( লর্ড এডওয়ার্ড ল; স্যার নিকলসন ও ডুপারনিক্স) কমিটির সুপারিশ অনুসারে 1904 সালের কো-অপারেটিভ ক্রেডিট সোসাইটিজ এ্যাক্ট জারি করা হয় । এ আইনের লক্ষ্য ছিল, গ্রামীন দরিদ্রদের মধ্যে সঞ্চয়, আত্ননির্ভরতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের জীবন ও জীবিকার উন্নয়ন ঘটানো ।

 

উক্ত আইনের আওতায় 1912 সালের জুন মাসের মধ্যে সারা উপমহাদেশে আট হাজারের অধিক সমিতি গড়ে উঠে । কিন্তু এ আইনে অকৃষি সমবায় সমিতি স্থাপনের যথোচিত গুরুত্ব না থাকায় এবং থানা/মহকুমা বা জেলা পর্যায় সমবায়ের কাজকর্ম সমন্বয়কারী হিসেবে কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক বা ফেডারেশন গঠনের ব্যবস্থা না থাকায় ঐ আইনের পরিবর্তে 1912 সালে কো-অপারেটিভ ক্রেডিট সোসাইটিজ এ্যাক্ট জারি করা হয় । ফলে কৃষি-ঋণ সমবায়ের পাশাপাশি তন্তুবায়ী, মৎস্যজীবী, দুগ্ধ উৎপাদনকারী, আখচাষী, ম্যালেরিয়া নিবরণ, ভোগ্য পণ্য সরবরাহ, ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপন ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রাথমিক, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সমবায় সমিতি গঠন পরিচালনার তৎপরতা শুরু হয় । 1915 সালের জুন মাসে, বঙ্গদেশ-সহ বিভিন্ন প্রদেশে সমবায় সমিতির সংখ্যা প্রায় পনের হাজারে পৌছে । সদস্য ও অসদস্যদের সঞ্চয় ও আমানতের মাধ্যমে সৃষ্ট তহবিল দ্বারা এবং সরকারের অতি সামান্য (কার্যকরী তহবিলের মাত্রা শতকরা তিন ভাগে) নিয়ে এ সমিতিগুলো তাদের উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করেছে । এখানে একটি বিষয়ের উল্লেখ অত্যাবশ্যক । গ্রামের সকল শ্রেনীর  দরিদ্রের যাবতীয় উন্নয়নের একমাত্র কেন্দ্রস্থল হিসেবে স্যার নিকলসন যে “সমবায় গ্রাম ব্যাংক” স্থাপনের সুপারিশ করেছিলেন, 1904 সালের এবং 1912 সালের সমবায় আইনে স্যার নিকলসনের  সেই সুপারিশ ও স্বপ্ন বহুলাংশে প্রতিপালিত হয়নি । আরো উল্লেখ্য যে, 1904 সালের কো-অপারেটিভ ক্রেডিট সোসাইটিস এ্যাক্ট প্রণীত হয়েছিল 1793 সালের ইংলিশ ফ্রেন্ডলী সোসাইটিজ এ্যাক্ট অনুসরণে ।

 

সংখ্যা বৃদ্ধি ও কর্মক্ষেত্র প্রসারের ফলে সমবায় সমিতি গুলোর ব্যবস্থাপনায় অযোগ্যতা, তহবিলের স্বল্পতা, শিক্ষামূলক তদারকীর অভাব, বেসরকারি নেতৃত্বে সংকট এবং সদস্যবর্গের ও জনগনের মধ্যে সমবায় সম্পর্কিত জ্ঞানের অভাব প্রকট হয়ে দেখা দেয় । এর পরিপ্রেক্ষিতে, স্যার এডওয়ার্ড ম্যাকলেগানকে নিয়ে 1914 সালে গঠিত “ইমপেরিয়াল কমিটি কো-অপরেটিভ ইন ইন্ডিয়া” সমবায় সমিতি গুলোর উক্ত সমস্যার নিরসন ও উন্নয়নকল্পে 1915 সালে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যাকে পরবর্তী কালে ভারতের জন্য “সমবায়ের বাইবেল” হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে । এ প্রসংগে উল্লেখ্য যে, সমবায়ের উল্লেখিত সমস্যা গুলো দূর করার লক্ষ্যে ম্যাকলেগান কমিটি যে সুপারিশ প্রদান করেন, তার অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়নি । 1919 সালে “মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার” অনুযায়ী সমবায়কে প্রাদেশিক বিষয় হিসেবে রূপান্তরিত করা হয় । ফলশ্রুতিতে, বিভিন্ন প্রাদেশিক সরকার তাদের চাহিদানুযায়ী আইন ও নিয়মাবলী প্রণয়ন করেন । বঙ্গদেশে বেঙ্গল কো-অপারেটিভ সোসাইটি এ্যাক্ট 1940 সালে এবং কো-অপারেটিভ রূলস 1942 সালে জারি করা হয় ।

 

          ইতোমধ্যে, 1929-34 সালের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মন্দার পলে, কৃষিপণ্যের মূল্য অস্বাভাবিক হ্রাস পেলে অধিকাংশ ঋণ গ্রহিতা কৃষি সমবায়ী ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয় । এজন্য আমানতকারীগণ ও সমবায় থেকে তাদের আমনত ফেরৎ পেতে সমস্যার সম্মূখীন হয় । ফলে জনমনে সমবয়ের উপর গবীর অনাস্থা সৃষ্টি হয় । পরবর্তীতে 1935 সালের বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ডেটরস এ্যাক্ট এবং গঠিত ঋণ-শালিসী বোর্ডের আওতায় সমবয়ের ঋণকে অন্তর্ভূক্ত করায় ঋণদান সমবায় সমিতি গুলোর, বিশেষতঃ কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকগুলোর পক্ষে বিপুল অংকের বকেয়া ঋণ আদায় করা অসম্ভব হয়ে পড়ে । ফলে সমবায় সমিতি গুলোর গোটা অস্তিত্ব ও কার্যক্রম বিপন্ন হয়ে পড়ে । এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (1939-43) এবং বাংলার দুর্ভিক্ষের (1943) অর্থ্যাৎ পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময়, বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থান) সমবায়ের কর্মোদ্যম নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে । 1947 সালের আগস্ট দেশ-বিভাগের সময়, বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থান) সমবায় সমিতির সংখ্যা ছিল 32,418 এবং তাদের সদস্য সংখ্যা ছিল 12,12,551। সমিতিগুলোর কর্মতৎপরতা সম্পর্কে রোল্যান্ড কমিটি (1945) বলেছেন, “এদের অধিকাংশই জীবন্মৃত” এবং পাকিস্তন ঋণ তদন্ত কমিশন (1950) বলেছেন, এগুলো যেন “ আত্মাহীন একটি দেহ” ।

 

          1947 থেকে 1970 পর্যন্ত এ 24 বছরে, বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) সমবায় ব্যবস্থা পুর্নগঠনের লক্ষ্যে 1953-58 সালে গ্রাম ভিক্তিক অসীম দায়িত্ব বিশিষ্ট মৃতপ্রায় গ্রাম সমবায় সমিতিগুলোকে রাতারাতি একচেটিয়া ভাবে লিকুইডেশন দেয়া হয় এবং তদস্থলে ইউনিয়ন ভিক্তিক বহুমুখী সমবায় সমিতি স্থাপন করা হয় । এ পূর্ণগঠন ব্যবস্থায় দেমের কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক গুলো দ্বিতীয় বারের মতো চরম আর্থিক বিপর্যয়ে পতিত হয় । কারণ লিকুইডেশন ভূক্ত গ্রাম সমবায় সমিতিগুলোতে কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক গুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে দাদনকৃত খেলাপী 290 লক্ষ টাকার অনুকূলে তৎকালীন সরকার কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক গুলোকে ক্ষতিপুরণ দান করেনি । লিকুইডেশন প্রক্রিয়ার ফলে, দেশে মোট সমিতির সংখ্যা 32,481 থেকে 1960 সালের জুন মাসে 5589-তে হ্রাস পায় । এই প্রক্রিয়ার সময়, দেশে কয়েকটি বৃহদাকার সমবায় প্রতিষ্ঠান ( যেমন প্রাদেশিক সমবায় ব্যাংক, সমবায় জুট মিল, জাতীয় শিল্প সমিতি, জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতি, আখচাষী ফেডারেশন, পরিবহন সমবায়, জাতীয় সমবায় ইউনিয়ন ইত্যাদি) স্থাপিত হয় । 1955 সালে স্টেট ব্যাংক এদেশের সমবায় গুলোকে কৃষি ঋণ দেয়া শুরু করে ।

 

          1960 সালে সমবায় অধিদপ্তর থেকে মাসিক ‘সমবায়’ এবং ইংরেজি ষান্মাসিক কো-অপারেশন পত্রিকাদ্বয়ের প্রকাশনা শুরু হয় । 17-02-1962 তারিখে সর্বপ্রথম “জাতীয় সমবায় নীতি” গৃহীত ও প্রচারিত হয় । 1961 সালে বাংলাদেশ জাতীয় (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) সমবায় ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক সমবায় মৈত্রী সংস্থার সদস্যভূক্ত হয় যার ফলে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশের সমবায় সমিতি গুলোর পরিচিতি ও সহযোগিতা প্রাপ্তির সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিলাভ করে । 1960 সালে ঢাকায় গ্রীন রোডে স্থাপিত বাংলাদেশ সমবায় কলেজ 1962 সালে কুমিল্লার কোটবাড়িতে স্থানান্তরিত হয় এবং পরবর্তীতে এর অধিনে 10টি আঞ্চলিক সমবায় শিক্ষায়তন স্থাপিত হয় । সরকারি সিদ্ধান্ত ক্রমে বাংলাদেশ সমবায় কলেজ 1998 সালে বাংলাদেশ সমবায় একাডেমীতে রূপান্তরিত হয় ।

 

          উল্লেখ্য পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী (১৯৫৫-৭০) পরিকল্পনার অধিনে প্রায় ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯টি সমবায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় । এতে করে সমবায়ের সংখ্যা, কর্মক্ষেত্রে ও উন্নয়ন তৎপরতা দ্রুততার সাথে বৃদ্ধিলাভ করে এবং স্বাধীনতার বছর (১৯৭১) ৩০শে জুন সমবায় সমিতি গুলোর সংখ্যা ৩৩,৫৬৬-তে উন্নতি হয় । বিভিন্ন উন্নয়ন-প্রকল্পের মাধ্যমে যিনি ঐ সময়ে সমবায়কে একটি গতিশীল ও সর্বোতমুখী গণ-আন্দোলনে পরিনত করতে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিনি হলেন সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক ও মহাপরিচালক (১৯৬০-৬৩) জনাব এ.কে.এম আহসান ।

 

          1947 সালে দেশ বিভাগের পর থেকে 1971 সালে স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত 24 বছরে, সমবয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রের সমবায় সমিতি গুলোর কর্মকান্ড ও তৎপরতা বহুগুণ বেড়েছে । সেই সাথে দরিদ্র সমবায়ীদের আত্ননির্ভরতার সুযোগ সৃস্টি হয়েছে । এবং তাদের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতিতে সমবায় পদ্ধতির কার্যকারিতা বিকশিত হয়েছে । কিন্তু কয়েকটি ক্ষেত্রে দেখা গিয়াছে যে, প্রকল্পাদীন উন্নয়ন ঋন ও অন্যান্য সহায়তা কর্মসূচি সমাপ্তি পর সমবায় সমিতি গুলোর সদস্যবৃন্দের আগ্রহ এবং তাদের তৎপরতা স্তিমিত হয়ে পড়েছে । বিভিন্ন সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও মাঠ পর্যায়ের জরিপের মাধ্যমে উল্লেখিত পরিস্থিতির কয়েকটি কারণ ও সনাক্ত করা হয়েছে । প্রথমত : সমবায় সম্পার্কে শিক্ষা ও সচেতনতার অভাব সমিতির অভ্যন্তরে সুযোগ্য নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা যোগ্যতা তৈরি হয়নি; দ্বিতীয়ত : প্রকল্পাধীন উন্নয়ন সহায়তা অপর্যাপ্ত হওয়ার দরূন সদস্যগনের পক্ষে উন্নয়ন কর্মসূচি অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়নি; তৃতীয়ত: সদস্যবৃন্দের বিভিন্ন সমস্যা ও চাহিদার প্রেক্ষাপটে তাদের সম্মিলিত প্রয়াস ও স্থানীয় সম্পদ, সমিতি গুলোর লক্ষ্য, কর্মসূচি ও বাস্তবায়ন কৌশালকে সুসংহত করা হয়নি; চতুর্থত: সমবায়ীদের বিভিন্ন মৌলিক সমস্যা, যেমন নিরক্ষরতা, অজ্ঞতা, রোগ, গৃহহীনতা, বেকারত্ব ইত্যাদি অবজ্ঞা করে শুধু ঋণ সরবরাহ করায় সদস্যগণ সার্বিক ও স্থায়ী অগ্রগতি অর্জন পারেনি । সমবায় আন্দোলনের এসব দুর্বলতা প্রকাশিত হয়েছে কয়েকটি তদন্ত প্রতিবেদন । আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কো-অপারেটিভ ফিল্ড মিশন (১৯৫৫) বলেছে যে, অনেক সমিতিতে সৃস্টি ক্যান্সার জাতীয় বিষফোড়া দমন না করায়, তা বৃদ্ধিলাভ করেছে, যদিও যথাসময়ে ঐ বিষফোড়া নির্ণয় করে অপারেশন করা হলে, রোগী-সমিতি গুলোকে বাঁচানো যেতো । ন্যাশনাল প্লানিং বোর্ডের (১৯৫৫-৬০) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, সমবায় আন্দোলনকে সরকারি কর্মকান্ডের এমন একটি রূটিনে অধঃপতিত করা হয়েছে, যে রূটিন দৃষ্টিকে বাধা প্রদান করে, উদ্যোগকে হত্যা করে এবং সকল উদ্দেশ্য বোধকে অন্ধকারাচ্চন্ন করে ।

 

          ১৯৭১ থেকে বর্তমান সময় (২০১3) পর্যন্ত ৪2 বছরে, দেশের সমবায় গুলো নানাবিধ সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিভিন্নমুখী কর্মসূচি নিয়ে দরিদ্রদের উন্নয়ন প্রসারের ধারা অব্যাহত রেখেছে । স্বাধীনতার অব্যবহিত পর ১৯৭২ সালে গৃহীত বাংলাদেশের সংবিধানে সম্পাদের মালিকানার ভিক্তিতে সমবায়কে একটি পৃথক ও দ্বিতীয় খাত হিসেবে ঘোষনা করা হয় । ১৯৭১-১৯৭২ অর্থবছরে দেশের বিভিন্ন থানায় কুমিল্লার দ্বি-স্তর সমবায় পদ্ধতির সম্প্রসারণকল্পে কার্যারম্ভ করে সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি (আই-আর-ডি-পি), যা ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বি-আর-ডি-বি) নামে রূপান্তরিত হয় ।

 

          স্বাধীনতা সংগ্রামকালে দেশের অধিকাংশ সমবায় সমিতি কম-বেশী আর্থিক ও বস্তুগত ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে । তা সত্ত্বেও স্বাধীনতার পরবর্তী বছর থেকেই সমবায় গুলো তাদের আর্থ-সামাজিক কর্মসূচি রূপায়নে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং অতীতের সমাপ্ত প্রকল্পগুলোর উন্নয়নে ধারা সুসংহত করে সমবায় গুলোর কর্মতৎপরতাকে যথাসাধ্য উৎসাহিত করে । এখানে আরো উল্লেখযোগ্য যে, স্বাধীনতার পর (1971-76) সালে গঠিত ও পরিচালিত কতিপয় সমিতির ( যেমন মহিলা সমিতি, পরিবহন সমিতি, দুগ্ধ সমিতি/ মিল্ক-ভিটা এবং বীমা সমিতির) কার্যক্রম ঐ সময়ে একদিকে সমবায়ের পরিমন্ডলে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে, অপরদিকে এদেশের দারিদ্র্য-বিমোচনে ও অর্থনীতি উন্নয়নে সমবায়ের অবদান ও প্রতিশ্রুতিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে ।

 

          দেশের সমবায় সমিতিগুলো যাতে সমবায়ের নীতিমালা অনুসারে এবং যথাযথ শৃংখলা ও যোগ্যতার সাথে স্ব-উদ্যোগে দরিদ্রদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে পারে, সেই লক্ষ্যে 1940 সালের সমবায় আইন ও 1942 সালের সমবায় নীতিমালা সংশোধন করে 1984 সালে সমবায় অধ্যাদেশ ও 1987 সালে সমবায় নিয়মাবলী প্রবর্তন করা হয় । কিন্তু এই সমবায় অধ্যাদেশ ও সমবায় নিয়মাবলী যুগপযোগী না হওয়ায় তা সংস্কারের বিষয়টি সাধারণ সমবায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল । 15 জুলাই 2001 তারিখে সরকার সমবায় সমিতি আইন, 2001 জারি করে । সমবায়ীদের দাবীর প্রেক্ষিতে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মতামতের ভিক্তিতে 2001 সালে সমবায় সমিতি আইনে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করে সমবায় সমিতি (সংশোধন) আইন 2002 জারি করা হয় । পাশাপাশি বর্তমান সরকার সমবায় নিয়মাবলী 1987 পরিবর্তন করে সমবায় সমিতি (সংশোধন) আইন 2002 এর আলোকে বাংলায় একটি যুগোপযোগী ও সমবায় বান্ধব সমবায় সমিতি বিধিমালা 2004 জারি করে । এখানে এভাবে সমবায় সমিতি আইন ও নিয়মাবলী সংস্কারের ফলে সমবায় প্রতিষ্ঠনে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ব্যবস্থা, মূলধন ও সম্পদ বৃদ্ধির সহায়ক বিধি প্রণয়ন, অযথা তদন্ত ও সরকারি হস্তক্ষেপ থেকে সমিতি গুলোকে মুক্ত রাখা, সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে আনা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, সমবায় ব্যবস্থাপনায় অসমবায়ীদের অনুপ্রবেশ রোধ করা এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির সহায়ক আইন করে সমবায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করা হয়েছে । সর্বশেষে 2013 সালে সমবায় আইনের কিছু ধারা মৌলিক পরিবর্তন করে “সমবায় সমিতি আইন 2013” জারি করা হয়েছে ।

 

          দেশের দরিদ্র মানুষের সীসিত সামর্থ ও সম্পদ একত্রিত করে দারিদ্র্য, ক্ষুধা, অজ্ঞতা, রোগ ও অন্যান্য আর্থ-সামিজিক সমস্য দূর করে সমাজের প্রত্যেক দরিদ্রকে সুস্থ, আত্ননির্ভর ও আলোকিত নাগরিক হিসাবে উন্নতি করাই সমবায় আন্দোলনের লক্ষ্য । এই লক্ষ্য নিয়ে, যে সব কর্মক্ষেত্রে উল্লেখিত সমবায় গুলো তৎপরতা চালিয়ে আসছে, তার মধ্যে রয়েছে কৃষি উৎপাদন, মৎস্য চাষ, কুটির শিল্প, দুগ্ধ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, পাটকল, পরিচালনা, মহিলা উন্নয়ন ও পরিবহন ।

 

          সমবায় একটি স্বেচ্ছাসেবী আর্থ-সামাজিক গণ-আন্দোলন,যার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হচ্ছে সামাজিক ন্যায়পরায়নতা ও অর্থনৈতিক মুক্তি কায়েম করা সমবায় অধিদপ্তরের প্রধান দায়িত্ব হলো, সমবায় সমিতি নিবন্ধন করা, সমিতিগুলোর ব্যবস্থাপনায় শৃংখলা নিশ্চিত করা এবং সদস্যদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য উন্নয়ন-উপকরণ বাবদ সহায়তা পেতে সাহায্যে করা । সমবায় আইন ও নিয়মাবলী মতে, সমবায় অধিদপ্তরের উপর এসব দায়িত্ব অর্পিত হয়ে আসছে 1904 সালে সমবায় আন্দোলন প্রবর্তনের শুরু থেকেই ।

 

          এটা অনস্বীকার্য যে, পৃথিবীর অন্যান্য দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ন্যায়, বাংলাদেশের সমবায় আন্দোলন নানাবিধ সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে । ইতোপূর্বে বাংলাদেশের সমবায় আন্দোলনের যে সব সমস্যা সনাক্ত করা হয়েছে, তারমধ্যে প্রথমেই উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সমবায় শিক্ষা উদ্বুদ্ধকরণের অপ্রতুলতা, যেজন্য সমবায় সমিতিগুলোর অব্যন্তরে আশানুরুপ গতিশীল নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বৃদ্ধি পায়নি । দ্বিতীয়তঃ দেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামে বিভিন্ন প্রকল্পাধীন বহুসংখ্যক প্রাথমিক সমিতি পাশাপাশি সংগঠিত হওয়ায়, এদের কোনটির পক্ষেই যথোচিত সদস্য ভর্তি, তহবিল সৃষ্টি বা ব্যবস্থাপনা যোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব হয়নি বিধায়, অধিকাংশ সমিতি নূন্যতম কর্মসূচি গ্রহণ বা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে । তৃতীয়তঃ গ্রামের অন্তত শতকরা 50 ভাগ পরিবার অশিক্ষা, খাদ্য-ঘাটতি, রোগ, বেকারত্ব, গৃহহীনতা ও পানীয় জল ও পয়ঃ-নিস্কাশনের সমস্যায় জর্জরিত হয়ে চরম দারিদ্র্য সীমার নীচে জীবন-যাপন করছে, অথচ তাদের সার্বিক কল্যাণের নিমত্ত সমবায় সমিতিগুলোকে যথোচিত সাহায্যে-সহায়তা দেয়া হয়নি । সমবায় সম্পর্কিত জাতীয় নীতিমালা ঘোষণার প্রেক্ষাপটেও সমবায় সমিতিগুলো বিশেষ প্রকল্প-সাহায্য পায়নি । চতুর্থতঃ সমবায়ীদের শিক্ষা, কৃষি উৎপাদন, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ভোগ্যপণ্য সরবরাহ, বিশুদ্ধ পানি ও সেনিটেশনের ব্যবস্থা, গৃহায়ন, রোগ-প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বহুবিধ সমস্যার সমন্বিত প্রতিকার না করে, সীমিত পরিমাণে ও অনিয়মিত ভাবে, তাদের শুধু ঋণের চাহিদা আংশিক ভাবে পূরণ করায়, দরিদ্র সমবায়ীরা সমবায়ের মাধ্যমে যথোচিত সুফল অর্জন করতে পারেনি । পঞ্চমতঃ অনেক সমিতি সঠিকভাবে গঠিত না হওয়ায়, স্থানীয় কায়েমীচক্র বিভিন্ন স্তরের সমিতিগুলোর সুযোগ-সুবিধা আত্নসাৎ করেছে; ফলে দরিদ্রদের উন্নয়নের সম্ভাবনা তিরোহিত হয়েছে । ষষ্ঠতঃ নিরক্ষেপ জরিপ ও গবেষণা দ্বারা সমবায় সমিতিগুলোর প্রকৃত ত্রুটি ও সমস্যাবলী উদঘাটন করে আন্দোলনকে পুনগঠিত ও প্রাণবন্ত করার প্রয়াস খুব কমই নেয়া হয়েছে । সমবায়কে গতিশীল ও স্বয়ংক্রিয় আন্দোলনে রূপান্তরিত করার লক্ষ্য বিভিন্ন সেমিনার ও ওয়ার্কসপে গৃহীত অনেক মূল্যবান সুপারিশ ও বাস্তবায়িত হয়নি ।

 

          সমবায়ের নানাবিধ সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার পরিপ্রেক্ষিতে কেউ কেউ বলে থাকেনা যে, এদেশের সমবায় আন্দোলন ব্যর্থ বা অকার্যকর প্রতিপন্ন হয়েছে । এহেন ধারণা মোটেই বাস্তবভিক্তিক নয় । প্রকৃতপক্ষে, আমাদের মতো দরিদ্র দেশের নানাবিধ সমস্যাক্লিষ্ট আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে, সমবায় সমিতিগুলোর সুষ্ঠু গঠন ও সুযোগ্য পরিচালনার জন্য যে শিক্ষা ও সচেতনতা, কারিগরি জ্ঞান, বস্তুগত উপকরণ ও চাহিদা উপযোগী অবকাঠামো প্রয়োজন ছিল, অনেক ক্ষেত্রে তা যথাসময়ে ও পরিমিতভাবে সরবরাহ বা প্রয়োগ করা হয়নি । এজন্য সমবায় পদ্ধতি বিফল হয়েছে মনে করা মোটেই সংগত নয় ।

 

এই প্রসঙ্গে সমবায় আন্দোলনের কয়েকটি সুস্পষ্ট সাফল্য ও অবদান উল্লেখের দাবি রাখে । দেশের হত-দরিদ্রদের প্রয়াসের প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্র হিসাবে সমবায় আন্দোলন প্রত্যেক গ্রামে ও শহরাঞ্চলের জন্য একটি সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করে দিয়েছে । তাদের সঞ্চয়ের অভ্যাস, ব্যাংকিং প্রথা প্রবর্তন ও উৎপাদন তহবিল বিনিয়োগ এই দেশের অর্থনীতিকে প্রাণবন্ত করে তুলতে সাহায্য করেছে । সমিতির সভা-সমাবেশ অংশগ্রহণ ও নির্বাহী কমিটি-নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে দরিদ্র নিরক্ষর ব্যক্তিগণ ও অর্থনৈতিক এবং গণতান্ত্রিক চর্চায় নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করেছে । দেশের সকল গ্রামে-গঞ্জে তৈরি হয়েছে সমবায় আদর্শ অনুপ্রাণিত ও নিবেদিত শত-সহস্র নেতা-কর্মী, যাদের অভিজ্ঞতা-সৃষ্ট দৃষ্টিভংগি ও স্বেচ্ছাসেবী-কর্মস্পৃহা সমবায়ের আগামী শতকের প্রত্যাশিত উন্নয়নধারাকে করে তুলবে সাবরলি ও সহজসাধ্য । এ প্রসংগে উল্লেখ্য যে, সমবায়ের আত্ননির্ভর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার প্রয়োজনে দেশের কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক গুলোসহ বহু-সংখ্যক চোট বড় সমবায় প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ন নিজস্ব অর্থায়নে অর্থাৎ সামান্যতম সরকারি অনুদান ব্যতিরেকে, অনেক আকর্ষণীয় ও মূল্যবান দালান-কোঠা ও উৎপাদনমূখী সম্পাদ সৃষ্টি করেছে, যে গুলো বহুদিন ধরে এদেশের সমবায় পদ্ধতির ও সমবায়ীদের সাফাল্য ও প্রতিশ্রুতির প্রতি অঙ্গুলী নির্দেশ করে আসছে । দারিদ্র্য-বিমোচনে ও গ্রামীন আর্থ সামাজিক উন্নয়নে এদেশের সমবায়ের কার্যকারিতা ও প্রতিশশ্রুতি উপলব্ধি করেই 1906 সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সর্বভারতীয় সমবায় বীমা সমিতি প্রতিষ্ঠায় প্রধান উদ্যেক্তার ভূমিকা পালন করেছেন । গত শতকের ত্রিশ দশকে শেরে-বাংলা ফজলুল হক ডিপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট হিসেবে একটি জেলার সমবায় সমিতি সমূহের সহকারী নিবন্ধক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন । পাশাপাশি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম দিল-দরাজ কণ্ঠে গেয়েছেন, “দুঃখ জয়ের নবীন মন্ত্র, সমবায় সমবায়” ।

 

এটা উপলব্ধি করতে হবে যে, এদেশের অজ্ঞ দরিদ্র গ্রামবাসীর জীবিকার তাগিদে বিদ্রোহ করেছিল মহাজনী ঋণের কুফল ও সহজ শর্তে কৃষি ঋণের অভাব, এ দুটি কারণে । এদেশের অজ্ঞ দরিদ্র গ্রামবাসীরা কখনো সমবায় –প্রথা প্রবর্তনের জন্য আন্দোলন করেনি, যদিও সামান্যতম শিক্ষা বা সচেতনতা না দিয়ে, সমবায়ের মতো একটি বিদেমী ধ্যান-ধারণা প্রসূত পদ্ধতিকে কল্যাণকামী উদ্দেশ্যে তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল । এমতাবস্থায়, আমাদের সহজ সরল অসহায় জনগোষ্ঠী ঐ সমবায় পদ্ধতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যে পরিমাণ উপকৃত হয়েছে ও যেভাবে জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে, তা কম সাফল্যজনক নয় । সমবায়ের এক শত বছরের ধারা –বিবরণীর এ পর্যায়ে বলা অত্যাবশ্যক যে, দেধের সমবায় গুলোর যে সব অবদান ও সাফল্য অর্জন করেছে, আমরা সেগুলোকে কোনমতেই যতেষ্ঠ মনে করছিনা । আমরা আশাবাদী হিসেবে এটাও মনে করা যে, দেশের সমবায় সমিতিগুলোর ব্যবস্থাপনায় যে সব ত্রুটি-বিচ্যুতি, সীমাবদ্ধতা বা ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হয়েছে, তা নিরাময়যোগ্য এবং এই উদ্দেশ্যে যথাযথ পদক্ষেপ-গ্রহণ ও সহায়তা-পদানের ব্যাপারে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার বদ্ধপরিকর । এই আশাবাদের ফলশ্রুতিস্বরূপ বর্তমান সরকার দারিদ্র্য-বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্ননের যে কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছেন, তাতে সমবায় খাতের ভূমিকা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে সমবায় সমিতিগুলোকে পুর্নগঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে । আমরা নিশ্চিত যে, সমবায় সমিতিগুলোর বুনিয়াদ পুর্নগঠন ও উন্নয়ন কর্মসূচী শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে আগামী ত্রিশ বছরের মধ্যে গোটা দেশ দারিদ্র্য ও বঞ্চনার অভিশাপ মুক্ত হবে ।

 

বাংলাদেশ সমবায়ের রয়েছে র্দীঘ একশত বছরের বর্ণাঢা ইতিহাস । রয়েছে নানান ঘাত-প্রতিঘাত, হতাশা-প্রত্যাশা ও সফলতা-বিফলতার বিচিত্র অভিজ্ঞতা । আমাদের আরো আছে বিভিন্ন পেশা ও সম্প্রদায়ের অগণিত সমবায়ীর নানাবিধ সমস্যার পরীক্ষিত প্রতিকার ও চাহিদার বাস্তব জ্ঞান এবং এর জন্য উদ্ভাবিত যুগোপযোগী উন্নয়নের রূপরেখা । এ সবের প্রেক্ষাপটে, এখন সমবায়কে দারিদ্র্য-দূরীকরণ ও আর্থ-সামাজিক মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে একটি স্বপরিচালিত ও গণ-সমদৃত ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করতে হবে । এ উদ্দেশ্যে, সমবায়ীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও সুপারিশের আলোকে অবলম্বন করা হবে র্দীর্ঘ-মেয়াদী পুর্নগঠন কর্মসূচী এবং উন্নয়নের বিস্তারিত ব্যবহারিক নীতিমালা ও কর্মকৌশল । উল্লেখ্য যে, এ বিষয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রয়েছে সর্বাত্নক সমর্থন ও অংগীকার । বলা আবশ্যক যে, এ ধরনের জাতীয়-ভিক্তিক কর্মতৎপরতা মধ্যে দারিদ্র্য সীশার হার অর্ধেকে নামিয়ে আনা এবং সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যেই সীমিত বা সমাপ্ত হবে না বরং তা সম্প্রসারিত ও বহুমুখী রূপ পরিগ্রহ করবে সমবায়ের পরবর্তী এক শতক পর্যন্ত ।

 

 

আন্তর্জাতিক সমবায় মৈত্রী সংস্থা, পতাকা ও দিবস

(আই-সি-এ)

১৮৪৪ সালে স্থাপিত ইংল্যান্ডের রচডেল সমতাবাদী অগ্রনীদের সমবায় সমিতিই পৃথিবীর প্রথম সফল সমবায় প্রচেষ্ট । অগ্রণীদের সাফাল্যের মূলে ছিল ইতি পূর্বে বর্ণিত তাদের অনুসৃত আটটি রীতিনীতি । সমবায়ের এ রীতিনীতিগুলোর উপর ভিত্তি করেই ক্রমে ইউরোপের জার্মানী, ফ্রান্স, ইটালীসহ অন্যান্য দেশে সমবায়ের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে । পরবর্তী কয়েক মধক আমেরিকা, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সমবায় আন্দোলণ বিস্তার লাভ করে ।

 

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সমবায় আন্দোলণ বিস্তার লাভ করার সাথে সাথে এর কর্মক্ষেত্রের ব্যাপকতা ও জটিলতা বাড়তে থাকে । একই সাথে বিভিন্ন দেশে ও আন্ত-সমবায় সম্পর্ক স্থাপন এবং পরস্পর কার্যপদ্ধতির সমন্বয় সাধনের আবশ্যকতা অনুভূত হয় ।

 

আই-সি-এর জন্ম :

        ১৮৯৫ সালে লন্ডনে একটি আন্তর্জাতিক সমবায় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় । উক্ত সম্মেলনে বেসরকারি সমবায় মতাদর্শের একটি আন্তর্জাতিক সংসদ গঠনের সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয় । তারই ফলশ্রুতিতে ১৮৯৫ সালে “আন্তর্জাতিক সমবায় মৈত্রী-সংস্থা” International Cooperative Alliance (I.C.A) জন্ম লাভ করে । লন্ডনেই প্রথম উহার সদর দপ্তর স্থাপিত হয় । কিছুকাল পরে আই.সি.এ,র প্রধান কার্যরয় লন্ডন থেকে জেনেভায় স্থানান্তর করা হয় ।

 

আই-সি-এর উদ্দেশ্যাবলী :

        ক) পৃথিবীর সর্বত্র সমবায়ের নীতি ও পদ্ধতি প্রচার করা এবং সমবায়ের প্রতি সাধারণ মানুষকে উদ্ধৃদ্ধ করা ।

          খ) সকল সমবায় সংগঠনের বিশ্বব্যাপী প্রতিনিধিত্ব করা ।

          গ) সদস্যভূক্ত সংস্থা সমূহের মধ্যে সু-সর্ম্পক রক্ষা করা ।

          ঘ) বিভিন্ন প্রকার সমবায়ের স্বার্থ সংরক্ষণ করা ।

          ঙ) জাতীয় ভাবে ও আন্তর্জাতিক ভাবে সকল সমবায়ের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সর্ম্পক গড়ে তোলা ।

          চ) শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য কাজ করা; এবং

ছ) সকল দেশের শ্রমজীবি মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সহায়তা করা ।

 

আই-সি-এর গৃহীত নীতিমালা :

        সমবায় আন্দোলনের প্রারম্ভ থেকে রচডেল সমবায়ীদের অনুসৃত 08টি সমবায় রীতিনীতিই পৃথিবীর সর্বত্র অনুসৃত হতে থাকে । ক্রমে পরিবর্তনশীল বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে রচডেল অনুসৃত নীতিসমূহের সংস্কার ও সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় । ফলে 1966 সালে অনুষ্ঠিত আই-সি-এর ভিয়েনা-কংগ্রেসে উক্ত নীতি সমূহ পর্যালোচনা করা হয় এবং সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ক্রমে সাতটি নীতি চুড়ান্ত ভাবে গ্রহণ করা হয় । এ গুলো বর্তমানে আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত ও অনুসৃত সমবায় নীতি বলে পরিগণিত । আই-সি-এ কর্তৃক গৃহীত নীতিমালা যথা :

১। স্বত:স্ফুর্ত ও অবাধ সদস্য পদ;

২। গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রন;

৩। সদস্যদের আর্থিক অংশগ্রহণ;

৪। সায়ত্বশাসন ও স্বাধীনতা;

৫। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও তথ্য;

৬। আন্ত-সমবায় সর্ম্পক;

৭। সামাজিক সম্পৃক্ততা ।

 

আই-সি-এর সদস্যপদ ও ব্যবস্থাপনা :

        সমবায়ের উপরোক্ত ছয়টি নীতি অনুসরণকারী যে কোন দেশের বা অঞ্চলের সমবায় সমিতি সমূহের প্রতিনিধিত্বকারী সমবায় সংগঠন আই-সি-এর সদস্যপদ লাভ করতে পারে । প্রত্যেক সদস্য সংগঠনকে প্রতিবছর আই-সি-এর তহবিল নির্ধারিত হারে বার্ষিক চাঁদা প্রদান করতে হয় । অবশ্য আই-সি-এর বিপুল ও ক্রমবর্ধমান ব্যয়র বিরাট অংশ নির্বাহ করে আসছে সুইডেনের সমবায় আন্দোলন ।

          আই-সি-এর 240 সদস্য বিশিষ্ট একটি কেন্দ্রীয় কমিটি রয়েছে। এ কমিটিই এর সর্বময় ক্ষমতা ও নীতি নির্ধারণের অধিকারী । অবশ্য এর অধীনে বেশ কয়েকটি সাব-কমিটি রয়েছে । চার বছর অন্তর কেন্দ্রীয় কমিটি একবার অধিবেশনে মিলিত হয় । এ অধিবেশন আই-সি-এর “কংগ্রেস” নামে খ্যাত ।

 

আই-সি-এর আঞ্চলিক অফিস সমূহ :

        বর্তমানে আই-সি-এর তিনটি আঞ্চলিক অফিস রয়েছে । তন্মধ্যে একটি ভারতের নয়াদিল্লীতে 1958 সালে স্থাপিত হয় । এর আওতায় রয়েছে সমগ্র এশীয় অঞ্চল । দ্বিতীয়টি তানজানিয়ার মুসিতে 1968 সালে স্থাপিত হয় এবং তার আওতায় রয়েছে পূর্ব আফ্রিকা, মধ্যে আফ্রিকা দক্ষিন আফ্রিকা। আর তৃতীয়টি স্থাপিত হয়েছে পশ্চিশ আফ্রিকার আইভরি কোষ্টের আবিদজানে 1984 সালে          । এর অধিনে রয়েছে সমগ্র পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সমূহ ।                                                                                                                                           সমবায় পতাকা ও দিবস

“সাত রংগা সমবায় পতাকা” যা আজ সারা বিশ্বে সমবায়ের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে, তা সর্বপ্রথম ফ্রান্সের প্রফেসর চার্লস ফুরিয়ার গাইড কর্তৃক প্যারিসে আয়োজিত ‘কৃষি শিল্প কর্মশালায় উত্তোলন করা হয় । উল্লেখ্য যে, প্রফেসর চার্লস গাইড সমবায়ের উপর একটি ছোট্ট পুস্তিকা রচনা করেন । এতে তিনি সাত রং এর সমন্বয়ে একটি সমবায় পতাকা তৈরির সুপারিশ করেন । পরে 1896 সালে প্যারিশে অনুষ্ঠিত আই-সি-এর দ্বিতীয় কংগ্রেসে সাত রংকে সমবায়ের প্রতীক হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব করা হয়। অত:পর 1920 সালে অনুষ্ঠিত আই-সি-এর সম্মেলনে অধ্যাপক চার্লস গাইডের পূর্ব প্রস্তাবিত সাত রংগা পতাকাকে আন্তর্জাতিক ভাবে ‘সমবায় পতাকা’ হিসেবে গ্রহণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । 1924 সালে অনুষ্ঠিত আই-সি-এর কংগ্রেসে তা আনুষ্ঠানিক ভাবে উত্তোলন করা হয় । এর পর প্রতি বছর জুলাই মাসের প্রথম শনিবারে সারা বিশ্বে ‘আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস’ উদযাপন উপলক্ষে সাত রংগা সমবায় পতাকাটি আনুষ্ঠানিক ভাবে উত্তোলন করা হয় ।

 

সমবায়ের সাত রংগা পতাকা সম্পর্কে প্রফেসর চার্লস গাইডের সুপারিশের মূলে যে অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ছিলো তা নিম্নরূপ :

 

পৃথিবীতে যত প্রকার রং আছে তার মধ্যে সাতটি রং হলো প্রধান, যথা : বেগুনী, নীল, আসমানী, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল । এদের আদ্যক্ষরগুলোকে এক শব্দে সাজিয়ে বলা যায়, ‘বেনীআসহকলা’ । আর এগুলোর ইংরেজি প্রতিশব্দ দাড়ায়, ‘VIBGYOR ’ অর্থাৎ Violet, Indigo, Blue, Green, Yellow,Orange and Red.

 

তাছাড়া সমবায় বিশ্বে আরেকটি দিন বিশেষ ভাবে পালিত হয়, তা হলো “জাতীয় সমবায় দিবস” । বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন তারিখে উক্ত দিবসটি উদযাপিত হয় । বাংলাদেশ তা উদযাপিত হয় প্রতিবছর নভেম্বর মাসের প্রথম শনিবারে । জাতীয় সমবায় দিবস উদযাপন উপলক্ষে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সমবায়ের এ সাত রংগা পতাকাটি সারম্বরে উত্তোলন কার হয় ।

*******

ছবি


সংযুক্তি


সংযুক্তি (একাধিক)



Share with :

Facebook Twitter